মাত্র ২০ লাখ টাকায় টেন্ডার দেওয়া দাকোপের লাউডোব ফেরিঘাটে চলতি বছর ৩ কোটি টাকারও বেশি দরপত্র পড়েছে। শুধু লাউডোব না, জেলার অন্যান্য ফেরিঘাট ও সেতুর রাজস্ব ৬ বছরের ব্যবধানে গড়ে তিন গুণ বেড়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেখ পরিবারের প্রভাবে এসব ঘাটের সিংহভাগ টাকা গেছে নেতাদের পকেটে।
২০১৯ সালে এ সাত ঘাট ও সেতুতে রাজস্ব নির্ধারণ ছিল প্রায় ৫ কোটি টাকা। বর্তমান বছরে যা বেড়ে দাড়িয়েছে প্রায় ১৪ কোটিতে। মামলা জটিলতায় খুলনা জেলখানা ঘাটের টেন্ডার প্রক্রিয়া তিনবার বন্ধ হলেও সওজ খুলনার কর্মকর্তাদের প্রচেষ্ঠায় ৬ষ্ঠ দরপত্র আহবান করা হয়েছে। ২২ ফেব্রুয়ারি রবিবার ছিল দাখিলের শেষ দিন। আজ ২৩ ফেব্রুয়ারি দরপত্র খোলা হবে। নানামুখি তৎপরতায় সরকার এই ৭ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৯ কোটি টাকার বর্ধিত রাজস্ব পেতে যাচ্ছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ ২০১৯ সালে পাইকগাছার শিবসা সেতু তিন বছরের জন্য ইজারা দেন মেসার্স নিহা এন্টারপ্রাইজ এর নামে। তার সর্বোচ্চ দর ছিল ৮২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ২০২২ সালে তিন বছরের জন্য সর্বোচ্চ দরদাতা মেসার্স আলী আকবর এন্টারপ্রাইজকে দেওয়া হয় ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকায়। চলতি বছর ওই সেতু ২ কোটি ৯৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা মেসার্স আর এস এস বায়তুল সালাম এন্টারপ্রাইজকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ইজারা দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ।
দিঘলিয়ার আড়ুয়াঘাট ২০১৯ সালে মাত্র ৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মেসার্স বিসমিল্লাহ মৎস্য আড়ৎকে দেওয়া হয়। চলতি বছর ওই প্রতিষ্ঠানই ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছেন। ২০২২ সালেও তারা সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ঘাটটি তাদের দখলে রাখেন। এখানে রাজস্ব বেড়েছে ৪ গুণেরও বেশি।
দাকোপের ঝপঝপিয়া ফেরিঘাট ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মেসার্স জিনিয়া এন্টারপ্রাইজ ১ কোটি ১৪ লাখ ৩৬ হাজার টাকায় ইজারা নেন। চলতি বছর ওই ফেরিঘাট ২ কোটি ৫৬ লাখ ২৫ হাজার টাকায় মেসার্স সোনালী এন্টারপ্রাইজ ৩ বছরের জন্য ইজারা নিয়েছেন। ২০২২ সালে মেসার্স নিহা এন্টারপ্রাইজ ১ কোটি ২৯ লাখ টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ঘাটটি ২০২৫ সাল পর্যন্ত ইজারা নেয়। এখানে রাজস্ব বেড়েছে সোয়া ২ গুণ।
দাকোপের পোদ্দারগঞ্জ ফেরিঘাট ২০১৯ সালে ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ইজারা নেয় মেসার্স ফারুক এন্টারপ্রাইজ। চলতি বছর ওই ফেরিঘাটটি ৬৭ লাখ ৬২ হাজার ৫’শ টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছে একই প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালেও একই প্রতিষ্ঠান মাত্র ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকায় ফেরিঘাটটি দখলে রাখেন। ৬ বছরে ইজারা বেড়েছে প্রায় ২৯ গুণ।
দৌলতপুরের নগরঘাট ফেরিঘাট ২০১৯ সালে মেসার্স হায়দার আলী মোড়ল ৫০ লাখ ২৬ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হয়ে ইজারা নেয়। চলতি বছর ঘাটটি ৯২ লাখ টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছে মেসার্স বিসমিল্লাহ মৎস্য আড়ৎ। ২০২২ সালে ঘাটটি ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হয় মেসার্স ফারদিন স্টোন বাজার। যদিও প্রতিষ্ঠানটি সড়ক বিভাগের ৫১ লাখ ৭৯ হাজার টাকা রাজস্ব না দেওয়ায় মামলা হয়েছে। বর্তমানে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক ফিরোজ মোল্লার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।
২০১৯ সালে জেলখানা ফেরিঘাট ৫০ লাখ ৪০ হাজার টাকায় ধ্রুব এন্টারপ্রাইজ সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ইজারাপ্রাপ্ত হয়। চলতি বছর ৫ম বার দরপত্রে সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছেন জহুরুল এন্ড সন্স। তার ইজারা মূল্য ৯৬ লাখ ১০ হাজার ৬২৫ টাকা। দ্বিতীয় দরদাতার ইজারা মূল্য ৯৫ লাখ ৬২ হাজার ৫’শ টাকা। ৬ষ্ঠ বার দরপত্র আহবানের আগে ৫ম বারের সর্বোচ্চ দরদাতা হাইকোর্টে মামলা করায় ইজারা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী হাইকোর্টে ওই মামলার জবাব শেষে পুনরায় ট্রেন্ডারের নির্দেশ পাওয়ায় ৬ষ্ঠ বারের জন্য দরপত্র আহবান করেছে। ২২ ফেব্রুয়ারি রবিবার দরপত্র দাখিলের শেষ দিন। আজ সোমবার দরপত্র খোলা হবে। তবে সড়ক বিভাগ নিয়মিত এ ঘাটের রাজস্ব আদায় করছে। প্রতিদিন রাজ্স্ব আদায় হচ্ছে ৭/৮ হাজার টাকা। যা প্রায় ৩ বছরে কোটি টাকার কাছাকাছি।
লাউডোব ফেরিঘাট ২০২২ সালে ২০ লাখ ২৫ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হয় এম এইচ ট্রেডার্স। চলতি বছর এ ঘাটটি ৩ কোটি ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫’শ টাকা ডাক দিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছেন নকশী বাড়ি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল।
একমাত্র রাজস্ব কমেছে কয়রা সেতুতে। কয়রা সেতু ২০১৯ সালে মোঃ মিনারুল ইসলাম সানা ১ কোটি ৫৯ লাখ ৫২ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ইজারা নেয়। ২০২২ সালে ওই সেতুর সর্বোচ্চ দরদাতা ১ কোটি ৯২ লাখ টাকায় ইজারা নেয় মোঃ আনার আলী দফাদার। চলতি বছর সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছে ১ কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় মেসার্স মেহমেদ কনস্ট্রাকশান । তবে আগের দু’দরদাতা সড়ক বিভাগে রাজস্ব বকেয়া রেখেছে। মিনারুল সানার কাছে পাওনা ২১ লাখ ৯১ হাজার টাকা। আদায় হয়েছে ৯ লাখ ৫০ হাজার। আর আনার দফাদারের কাছে পাওনা ৭৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। মামলা করা হয়েছে। তার কিস্তি প্রতিবার ৫০ হাজার টাকা। না দেওয়ায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।
সওজের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহিদুর রহমান বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়তে হয়েছে। মামলাও হয়েছে। তবে সব মামলায় সওজের পক্ষে রায় হয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ তানিমুল হক বলেন, রাজস্ব আদায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। এখনও অব্যাহত আছে। বিভিন্ন চাপ রয়েছে। তবে যে কোন মূল্যে রাজস্ব আদায়ের ধারা অব্যাহত রাখা হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে চেষ্টা করেছি। অনেক সময় নানা জটিলতা সামনে এসেছে। তবে সব প্রতিবন্ধকতা দুর করে এসব ফেরিঘাটে ও সেতুতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সেক্ষেত্রে গণমাধ্যম জোরালো ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
খুলনা গেজেট/এনএম

